ইতিকাফের বিধি-বিধান গুরুত্ব ও ফজিলত:মুফতি ওসমান আল-হুমাম উখিয়াভী- জনকল্যাণ২৪

প্রকাশিত: ১০:৫৫ পূর্বাহ্ণ, মে ৩, ২০২১

ইতিকাফের বিধি-বিধান গুরুত্ব ও ফজিলত:মুফতি ওসমান আল-হুমাম উখিয়াভী- জনকল্যাণ২৪

ইতিকাফের পরিচয়
‘ইতিকাফ’ আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো অবস্থান করা, আবদ্ধ করা বা আবদ্ধ রাখা। নির্দিষ্ট শর্তের সাথে মসজিদে অবস্থান করা। আর তা হলো, জাগতিক কার্যকলাপ ও পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র সওয়াবের নিয়তে মসজিদে বা ঘরের নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করা। যিনি ইতিকাফ করেন, তাঁকে ‘মুতাকিফ’ বলে।
ইতিকাফের হুকুম
ইতিকাফ সারা বছরই সুন্নত তবে রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করাই উত্তম। কেননা রাসূল সা. রমজানের শেষ দশদিন সবসময় ইতিকাফ করে গেছেন।
ইতিকাফকারী কখন ঘর থেকে বের হবে?
২০ রমযান মাগরিবের পূর্ব হতে ঈদের চাঁদ উদয় হওয়ার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মসজিদে অবস্থান করার নাম ইতিকাফ। এই ইতিকাফ সুন্নতে মুয়াক্কাদা কিফায়া অর্থাৎ একজন ব্যক্তি যদি আদায় করে, তাহলে সুন্নত আদায় হয়ে যাবে। নতুবা সবাই সুন্নত ত্যাগ করার জন্য গোনাহগার হবে।
ইতিকাফের পূর্ব ইতিহাস
আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে রোযার মতোই ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে ইতিকাফের বিধান থাকার কথা। তবে পূর্বেকার নবীদের যুগে ইতিকাফের বিধান কেমন ছিল, তা বলা মুশকিল। তবে হযরত দাউদ আ. ও হযরত মুসা আ. সহ বিভিন্ন নবী ও তাদের উম্মতের জীবনী থেকে ইতিকাফের সন্ধান পাওয়া যায়। এমনকি বিধর্মীদের মধ্যেও ইতিকাফের নিয়ম ছিল বলে হাদিসের কিতাবে পাওয়া যায়। হযরত উমর ফারুক রা. একদিন রাসূল সা.কে জিজ্ঞেস করলেন—ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমি জাহেলি যুগে ‘মসজিদুল হারামে’ এক রাত ইতিকাফের মানত করেছিলাম। রাসূল সা. বলেন, তোমার মানত পূরণ করে নাও।
এ হাদিস থেকে বুঝা যায়, হযরত উমর রা. অমুসলিম থাকা অবস্থাতেও ইতিকাফের মান্নত করেছিলেন। পবিত্র কুরআনেও উল্লেখ আছে—‘তাওয়াফ ও ইতিকাফকারীদের জন্য আমরা ঘর পবিত্র করো।’
এ আয়াত থেকেও পূর্বকালে ইতিকাফের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে তাদের ইতিকাফের উদ্দেশ্য এবং ধরন ছিল ভিন্ন। কিন্তু ইসলাম ইতিকাফকে প্রথাগত প্রচলন না করে বিশুদ্ধ ইবাদতে পরিণত করেছে এবং অন্যান্য ইবাদতের মতোই ইতিকাফের জন্য বিভিন্ন ধরনের শর্তাবলি আরোপ করেছে। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. বলেন, ‘রাসূল সা. মৃত্যু পর্যন্ত রমযানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। এমনকি রাসুলের স্ত্রীগণও ইতিকাফ করতেন।’
ইতিকাফের ফযিলত
কুরআনে কারীমে ১২ মাসের মধ্যে স্বতন্ত্রভাবে একমাত্র রমযান মাসের কথা উল্লেখ আছে। রমযানের প্রতিটি দিন-রাত, প্রতিটি মুহূর্ত বরকতময় ও বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। পূর্ণ মাসই যেন সওয়াবের অসাধারণ প্যাকেজ। এই দশকেই সাধারণত শবে কদর এসে থাকে। তাই এই দশকের ইতিকাফে বিশেষ ফযিলত রয়েছে। রাসূল সা. নিজেও এই দশকে ইতিকাফ করেছেন।
ইতিকাফের শর্ত সমূহ
ইতিকাফের জন্য শর্ত হচ্ছে, এমন মসজিদে ইতিকাফ করতে হবে, যেখানে নামাযের জামাত হয়। জুমা হোক বা না হোক। এ শর্ত পুরুষের ইতিকাফের ক্ষেত্রে। মুস্তাহাব হলো, ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম মসজিদ নির্বাচন করা। সর্বোত্তম মসজিদ যেমন মসজিদুল হারাম তারপর মসজিদে নববী, তারপর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর যে জামে মসজিদে জামাতের ব্যবস্থাপনা আছে, তারপর মহল্লার মসজিদ। তারপর যে মসজিদে বড় জামাত হয়। তবে মহিলাদের জন্য মসজিদে ইতিকাফ করা মাকরুহে তাহরীমি। তারা ঘরে ইতিকাফ করবে। স্বামী থাকলে ইতিকাফের জন্য স্বামীর অনুমতি নিতে হবে। স্বামীর খেদমতের প্রয়োজন থাকলে ইতিকাফে বসবে না। শিশুর তত্ত্বাবধান ও যুবতী কন্যার প্রতি খেয়াল রাখার প্রয়োজনীয়তা থাকলে ইতিকাফে না বসাই সমীচীন। মহিলারা নির্দিষ্ট কোনো কামরায় বা ঘরের কোণে একস্থানে পর্দা ঘিরে ইতিকাফে বসবে। মহিলাদের জন্য ইতিকাফের অন্যান্য মাসায়েল পুরুষের মতোই। তবে মহিলাদের ঋতুস্রাব শুরু হলে ইতিকাফ ছেড়ে দিবে। ইতিকাফের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। কারণ, নিয়ত ছাড়া প্রত্যেক কাজের শুধু অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে না।
ইতিকাফের প্রকারভেদ
ইতিকাফ তিন প্রকার। এক, ওয়াজিব ইতিকাফ, যা ইতিকাফের মানতের নিয়ত করার কারণে ওয়াজিব হয়ে যায়। দুই, সুন্নতে কিফায়া, যা রমযানের শেষ দশকে আদায় করতে হয়। তিন, নফল ইতিকাফ, যা রমযানের শেষ দশকে ছাড়া যে কোনো সময়ে করা যায়। চাইলে পহেলা রমযানের থেকে বিশ তারিখ পর্যন্ত নফল ইতিকাফ করতে পারবে।
ইতিকাফের সময়সীমা কতটুকু?
নফল অথবা মুস্তাহাব ইতিকাফের জন্য মসজিদে কতটুকু সময় অবস্থান করা জরুরি, এ সম্পর্কে ‘তানবিরুল আবসার’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, নফল ইতিকাফ সামান্য সময়ের জন্যও হতে পারে। অর্থাৎ কেউ অল্প সময়ের জন্য মসজিদে ইতিকাফের নিয়তে অবস্থান করে, ইতিকাফ বলে গণ্য হবে। এ কারণে উলামায়ে কেরাম বলেন, নামাযের জন্য মসজিদে প্রবেশের সাথে সাথে ইতিকাফের নিয়ত করে নেয়া ভাল তাতে নামাযের সাথে সাথে নফল ইতিকাফের সওয়াবও পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অধিক সময় অবস্থানের ব্যাপারে কোনো সীমা নেই। কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলে সারা জীবন ইতিকাফ করে কাটাতে পারবে। কিন্তু ‘সাওমে বেসাল’ বা ইফতার না করে অনবরত রোযা রাখা কিংবা ‘সাওমে দাহর’ অর্থাৎ সারা বছর রোযা রাখা শরিয়তে যেরূপ অপছন্দনীয়, তেমনিভাবে জাগতিক সব কিছু বিসর্জন দিয়ে পরিবার-পরিজনের দায়দায়িত্ব ছেড়ে সারা বছর ইতিকাফ করাও অপছন্দনীয়। এবং এটি মানুষের স্বভাববিরুদ্ধ চাহিদাও বটে। তবে জীবনের কখনো যদি কেউ লাগাতার ইতিকাফ করতে চায় আর এতে পরিবার-পরিজনের অথবা অন্যদের হক ও প্রয়োজনীয় কাজকর্মের অসুবিধা না হয়, তাহলে এটি প্রশংসংনীয়। উপরে আলোচনা হয়েছে, নফল ইতিকাফের সময়সীমা নিয়ে। সুন্নতে কিফায়া ইতিকাফ কেবল রমযান মাসের শেষ দশ দিন করতে হয়, অন্য সময় নয়। আল্লামা ইউসুফ বান্নুরী রহ. বলেন, (তিন প্রকারের দ্বিতীয় প্রকার ইতিকাফ হলো) সুন্নতে কিফায়া। এটি রমযানের শেষ দশকে আদায় করতে হয়। এই ইতিকাফ নয় দিনেরও হতে পারে। কারণ, অনেক সময় রমযান ২৯ দিনের হয়।
আর ওয়াজিব ইতিকাফের জন্য ন্যুনতম সময় হলো একদিন। এর চাইতে কম সময়ের জন্য ইতিকাফের মান্নত হয় না। তবে যত দিনের ইচ্ছা, তত দিনের ইতিকাফের মান্নত করা যায়। কিন্তু যে সব দিনে রোযা রাখা নিষেধ, সে সব দিনে ইতিকাফের মান্নত করা জায়েজ নেই। কারণ, মান্নত ইতিকাফের সময় রোযাও রাখতে হয়। রোযা ছাড়া মান্নতের ইতিকাফ আদায় হয় না।

লেখক : তরুণ মুহাদ্দিস জামিয়া ইসলামিয়া বাইতুল কারীম।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ