পিতা মাতার হক আদায় না করার পরিণাম: মাসুম আল মাহদী- জনকল্যাণ২৪

প্রকাশিত: ৫:০৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১

পিতা মাতার হক আদায় না করার পরিণাম: মাসুম আল মাহদী- জনকল্যাণ২৪

সৃষ্টিজগতে মানুষের প্রতি সর্বাধিক অনুগ্রহ প্রদর্শনকারী ব্যক্তি হচ্ছেন পিতা-মাতা। পিতা-মাতাই মানুষের সর্বাধিক আপনজন। এ প্রসঙ্গে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আর আমি মানুষকে তার পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করার আদেশ দান করেছি, তার মা তাকে অতিকষ্টে গর্ভে ধারণ করেছেন এবং অতিকষ্টে তাকে প্রসব করেছেন।’ (সূরা: আহকাফ্ব, আয়াত: ১৪)

 

পৃথিবীতে পিতা-মাতার হক আদায় না করার পরিণাম ভয়াবহ। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বিশদ বর্ণনা রয়েছে। পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা যেমন সন্তানের কর্তব্য, তেমনি তাদের সঙ্গে সম্পর্কছেদ করা কবীরা গুনাহ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় গুনাহ সম্পর্কে অবগত করব না? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে রাসূলুল্লাহ ! তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, পিতা-মাতার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করা। এছাড়াও হজরত আবু উমামা (রা.) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সা.) নিকট আরজ করলো, হে আল্লাহর রাসূল! সন্তানের ওপর পিতা-মাতার হক কি আছে ? তিনি বললেন, তারা তোমার বেহেশত ও দোযখ”। (ইবনে মাজাহ-৪৯৪১)

 

হাদিসটির মূল কথা হচ্ছে, সন্তান পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করলে বেহেশতের অধিকারী হবে এবং পিতা-মাতার অধিকারসমূহকে পদদলিত করলে, পিতা-মাতার চেয়ে অন্য কোনো মানুষকে, আত্মীয়-স্বজনকে অগ্রাধিকার দিলে দোযখের অধিকারী হবে।

 

রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তার নাক ধূলায় মলিন হোক (৩ বার), সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেই হতভাগ্য ব্যক্তিটি কে? রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, সে হলো ঐ ব্যক্তি, যে তার পিতা-মাতা উভয়কে অথবা একজনকে পেল অথচ তাদের সেবা করে জান্নাত হাসিল করতে পারলো না’ (মুসলিম-৪/১৯৭৮, হা-২৫৫১) অর্থাৎ তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করলে সে জান্নাতে যেত। অর্থাৎ সে জান্নাত পেয়েও জান্নাতে গেল না, সে বড় হতভাগ্য।

 

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, ‘আল্লাহর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং আল্লাহর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে নিহিত।’ (তিরমিযি-১৮৯৯)

 

পিতা-মাতার সঙ্গে নাফরমানীর শাস্তি দুনিয়াতে দেয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হজরত আবু বারকাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছা করলে সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিতে পারেন, পিতা-মাতার নাফরমানী ব্যতিত। আর তিনি পিতা-মাতার অবাধ্যতার শাস্তি মৃত্যুর পূর্বে দুনিয়াতেই দিয়ে দেন। (মুসতাদরাক-৭৩৪৫)

 

পিতা-মাতার হক আদায়ের গুরুত্ব ও ফজিলত সকল হাদিসে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণিত আছে যে, এক ব্যক্তি তার বৃদ্ধ মাতাকে কাবা শরীফে নিয়ে আসে। সে তাকে তার কাঁধে নিয়ে কাবা শরীফের চারপাশে তাওয়াফ করতে থাকে। সে রাসূল (সা.)-কে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করল, আমি কি এখন আমার মায়ের প্রতি কর্তব্য পালন করেছি? রাসূল (সা.) তাকে উত্তর দিলেন, তুমি তোমার মায়ের একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের হকও আদায় করনি। (বুখারী: আদাবুল মুফরাদ-০৯, হা- ২৬৬ইবনে কাসীর, ৩য় খণ্ড)

 

এক ব্যক্তি (সাদ বিন ওবাদা) রাসূলুল্লাহ (সা.) এর দরবারে এসে আরজ করেন, ‘(হে আল্লাহর রাসূল!) আমার মা অকস্মাৎ ইন্তেকাল করেছেন এবং তিনি কোনো অসিয়ত করে যাননি। তবে আমার মনে উদয় হয়েছে, তিনি তা চাইলে হয়তো কোনো দান-সদকা করার কথা আমাকে বলতেন। এক্ষণে আমি তার পক্ষ থেকে কোনো দান-সদকাহ করলে তিনি কি এর সওয়াব পাবেন? মহানবী (সা.) জবাবে এরশাদ করেন, ‘হ্যাঁ।’

 

এমতবস্থায় ওই ব্যক্তি বলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.)! আমি আপনাকে আমার (খেজুর) ফলে পরিপূর্ণ বাগানটি সদকাহ হিসেবে দানের ব্যাপারে সাক্ষী করলাম’ তিনি বললেন হ্যাঁ। অন্য বর্ণনায়- আমি বললাম কি ছদকা দেবো? উত্তরে বললেন, পানি পান করার ব্যবস্থা কর। (অর্থাৎ কূপ খনন করে দাও)। হজরত সা’আদ (রা.) একটি কূপ খনন করে বলেছিলেন ‘এটা সা’দের মায়ের নামে উৎসর্গীত হলো।’ (আল-বোখারী, ‘অসিয়ত’ অধ্যায়, ৪র্থ খণ্ড, বাব নং ৫১, হাদীস নং ১৯. মুসলিম, ‘অসিয়ত‘ অধ্যায়, বাব নং ১৩, হাদীস নং ৪০০৩)

 

পরিশেষে আলোচনার মূলকথা হলো পিতা-মাতা সন্তানকে লালন-পালন করে বড় করে তোলে। সে কারণে ইসলাম পরিবারের বন্ধনকে সুদৃঢ় করার জন্য মাতা-পিতার প্রতি সন্তানের কিছু দায়িত্ব-কর্তব্য নির্ধারণ করেছে।

 

বাবা-মার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদেরকে সম্মান করা এবং তাদের আনুগত্য করা একজন সন্তানের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে মা-বাবার উপযুক্ত খেদমত করার তাওফিক দান করুন।আমীন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ