আজ জেলহত্যা দিবস: ইতিহাসে আরেক ট্রাজেডি-জনকল্যাণ২৪

প্রকাশিত: ৬:০৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৩, ২০২০

আজ জেলহত্যা দিবস: ইতিহাসে আরেক ট্রাজেডি-জনকল্যাণ২৪

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে সেনাবাহিনীর একটি অংশের সহায়তায় কিছু ‘বিপথগামী’ সেনাসদস্যকে দিয়ে সপরিবারে হত্যা করা হয় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর মধ্যরাতে সেই সেনাসদস্যরা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ঢুকে নির্মমভাবে হত্যা করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী জাতীয় চার নেতাকে।

কারাভ্যন্তরে কুচক্রী খুনিদের হাতে প্রাণ দেয়া জাতীয় এ চার নেতা হলেন মহান মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের তথা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামান। কারাগারের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকাবস্থায় এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এ চার নেতাকে কারাগারে পাঠিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা এদিন প্রথমে গুলি ও পরে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব দেন জাতীয় এ চার নেতা। মূলত যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, তারা স্বাধীনতার স্থপতিকেও হত্যা করতে চেয়েছিল স্বাধীনতার সময়েই।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় হায়েনাদের পক্ষে যা সম্ভব হয়নি, তা-ই তারা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতাপ্রাপ্তির চার বছরের মাথায় জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার মাধ্যমে। তারা ভালো করেই জানত, বঙ্গবন্ধু চলে গেলেও তার আদর্শের বাহক রয়ে গেছেন অনেক। সেই অনেকের চারজনকে যখন একসঙ্গে জেলখানায় পাওয়া গেল, তখন হায়েনারা আর সময় নষ্ট করেনি।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঘুমন্ত বাঙালিদের ওপর ট্যাংক, কামান ও মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই বাঙালি নিধনে মেতে উঠেছিল তারা। বাধ্য হয়ে বাঙালি জাতিও অস্ত্র হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিল। সেই যুদ্ধেও জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের অনুসারীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছিল।

রাজাকার, আলবদর, আলশামসসহ বিভিন্ন বাহিনী গড়ে তুলেছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর পাশাপাশি তারাও মুক্তিকামী মানুষকে হত্যার উৎসবে মেতেছিল। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে সেই যুদ্ধে বাঙালি বিজয়ী হয়। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হেরে যায় তাদের এ দেশীয় দোসররাও। কিন্তু তারা সেই পরাজয় মেনে নেয়নি এবং নিজেদের অবস্থান থেকেও সরে আসেনি।

তারাই পরবর্তীকালে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে এবং নানা রকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে এবং কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করা ছিল সেই ষড়যন্ত্রেরই অংশ। এ হত্যাকাণ্ড শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, বিশ্বমানবতার ইতিহাসেও এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। কারাগারের নিরাপত্তানীতি ভেঙে রাতের অন্ধকারে এভাবে জাতীয় নেতাদের হত্যার ঘটনা বিশ্বে বিরল।

পৃথিবীর ইতিহাসে জেলহত্যা দিবস এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। কারাগারের অভ্যন্তরে এ ধরনের বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। পৃথিবীর যে কোনো আইনে জেলের ভেতর হত্যা করা একটি জঘন্য অপরাধ। সেই অপরাধের বিচার বন্ধ করা আরও বড় অপরাধ। কিন্তু লজ্জাজনক হলেও সত্য, এ বিচার নিষিদ্ধ করে একটি সংশোধনী সংবিধানে সংযোজন করে হত্যাকারীদের নিরাপদে দেশত্যাগ করার সুযোগ করে দেয়া হয়। পরে তাদের পররাষ্ট্র বিভাগের অধীনে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়।

জাতীয় চার নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার এ ঘটনায় তখনই লালবাগ থানায় মামলা করা হলেও দীর্ঘ ২১ বছর এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ রাখে সেই সময়ের সরকারগুলো। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার জেলহত্যা মামলার প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করে। এরপর দীর্ঘ ৮ বছরেরও বেশি সময় বিচারকাজ চলার পর গত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত মামলাটির রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ২০ আসামির মধ্যে ১৫ সাবেক সেনা কর্মকর্তার শাস্তি এবং অপর পাঁচজনকে খালাস দেয়া হয়। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে পলাতক তিন আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাসেম মৃধাকে খালাস দেন। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সরকার পক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে নিু আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, তবে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ ও এলডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়।

২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল ওই আপিলের ওপর রায় দেন সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনাসদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিু আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করেন।

জেলহত্যার বিচার ও রায় কার্যকর করার ভেতর দিয়ে ইতিহাসের আরেক কলঙ্ক থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। বিদেশে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে আনতে হবে। দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতেও এ মামলার আসামিদের দণ্ড কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ