একটি সফর, একটি প্রচারিত ফোন রেকর্ড এবং কিছু কথা

প্রকাশিত: ৮:২১ পূর্বাহ্ণ, জুন ২৯, ২০২০

একটি সফর, একটি প্রচারিত ফোন রেকর্ড এবং কিছু কথা

সাম্প্রতিক একটা বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে আলেমসমাজে। ধীরেধীরে  রূপ নিচ্ছে ষড়যন্ত্রের। এ দ্বন্দ্ব নিরসনে মারকাযুল হিদায়া সিলেটের পরিচালক মুফতি নূরুযযামান সাঈদ দা.বা. লম্বাচওড়া এক আলোচনা নিজ ফেসবুক আইডি থেকে “একটি সফর, একটি প্রচারিত ফোন রেকর্ড এবং কিছু কথা” শিরোনামে পোস্ট করেন। লেখাটা পড়লে অনেকের মনের ভেতরে জমে থাকা সন্দেহ এবং ক্ষোভের বিনাশ ঘটতে পারে বলে মনে করি।

হযরতের ফেসবুক স্ট্যাটাস হুবহু তুলে ধরা হল।

এক.
কিছু জরুরি কাজে ঢাকা সফরের ফিকির করছিলাম বেশ কয়েকদিন থেকে। প্রথমত মাদরাসাতুল মাদীনাহ পরিদর্শন ও মাদানী মাকতাবের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগতি লাভ, দ্বিতীয়ত উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়।

সেমতে ০২.০৪.২০১৯ রাতের ট্রেনে ঢাকা রওনা করি। আমি এবং মারকাযুল হিদায়ার সহকারী পরিচালক ও আমীনুত তা’লীম মাওলানা আবদুর রহমান কফিল হাফিযাহুল্লাহ। পরদিন ০৩ এপ্রিল বুধবার ভোরে ঢাকা পৌঁছি। যাত্রাবাড়িস্থ জামিয়া মাহমুদিয়া ঢাকার মুহতামিম মুফতী ইমামুদ্দীন সাহেবের বাসায় বিশ্রাম ও সকালের নাস্তা সেরে মুফতি ইমাম উদ্দীন সাহেবের বাইকে মা’হাদুশ শায়খ ফুআদে গমন করি। উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহ তাঁর রুটিনের বাইরে এসে আমাদের আন্তরিকভাবে বরণ করেন। হালপুরসি হলো। মারকাযুল হিদায়ার খোঁজখবর নেন এবং খুব মেহমানদারি করেন।

মুফতি ইমাম উদ্দীন সাহেবকে বিদায় দিয়ে এরপর আমরা দু’জন ২/১ জায়গায় অল্প কিছু কাজ সেরে বাদ মাগরিব হযরতপুরে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ায় পৌঁছি। মারকাযুদ দাওয়াহ’র উলূমুল হাদীস বিভাগের তালিবুল ইলম আমার ছোট ভাই হাফিয মাওলানা হানিফ আহমদ আমাদের ইস্তিকবাল করে মারকাযুদ দাওয়াহ’র মেহমানখানায় নিয়ে যায়। এশার নামাযের পর কয়েকজন উস্তাযের সঙ্গে মুলাকাত করি। মাওলানা সাঈদ আহমদ (কুমিল্লার হুযূর)’র সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়। যেহেতু কুমিল্লার হুযূর ফুআদ সাহেব হুযূরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয় এবং মুরুব্বি, তাই সঙ্গত কারণে ফুআদ সাহেবের হালাত সম্পর্কে জানতে চাই। প্রায় ঘন্টা খানেক আলোচনা হয় এবিষয়ে।

পরদিন সকালে আমরা মাদরাসাতুল মাদীনায় গমন করি এবং পূর্বানুমতি হিসাবে মাদানী মাকতাবের পাঠদান পদ্ধতি বুঝতে দরসে শরিক হই। আসরের নামাযের আগে আগে আবার মারকাযুদ দাওয়ায় চলে আসি। বাদ আছর মাওলানা আবদুল মালেক হাফিযাহুল্লাহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। জরুরী কিছু কথাবার্তা হয়। এরপর আমরা রওনা করি মাদানীনগর মাদরাসার উদ্দেশে। রাত ১০ টার দিকে মাদরাসায় পৌঁছি। তখনও উস্তাযে মুহতারাম মুফতি ফারুযযামান হাফিযাহুল্লাহ খাবার নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করছিলেন। দস্তরখানের আমল শেষে হুযূরের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহ কেনো মাদানীনগর থেকে চলে গেলেন, বা তাঁকে কেনো বিদায় দেওয়া হলো এ বিষয়েও লম্বা আলোচনা হয়।

দুই.
এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহুর হালাত জানার প্রসঙ্গটি কেনো আসলো? হুযূরের সঙ্গে মতবিনিময়ের প্রেক্ষাপট কেনো তৈরি হলো? এর জবাব জানতে হলে আমাকে একটু পেছনে যেতে হবে।

১৪৩৯ হিজরীর মাঝামাঝিতে উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহ সিলেট সফরে আসেন। তখন আমি জামেয়া মারকাযুল উলূম মোহাম্মদপুরে খেদমতে। তখন আমরা মারকাযুল হিদায়া সিলেট’র কার্যক্রম অনেকটা গুছিয়ে এনেছি। হুযূর আমার রুমে বসে মারকাযুল হিদায়া সিলেটের প্রচারণা লিফলেটের ফাইনাল প্রুফ দেখে দেন। হুযূরের কথা থেকে আমরা বুঝতে পারি, হুযূর মাদানীনগর থেকে বিদায় নিয়ে নিবেন। তখনই আমি হুযূরকে রাজি করাই মারকাযুল হিদায়া সিলেট’র কিসমুল লুগাহর মুশরিফের যিম্মাদারি গ্রহণ করতে। আমরা বারবার আবদার করায় হুযূর রাজি হন। তখন পর্যন্ত আমরা উস্তাযে মুহতারামকে ছাত্র যামানায় যেমন দেখেছি তেমনই জানতাম। এই দীর্ঘ ১০/১১ বছরে হুযূরের নযরিয়ায় আমূল পরিবর্তন এসেছে এটা আমরা জনতাম না।

যাই হোক, এরপর রামাযানুল মুবারাক থেকে মারকাযুল হিদায়ার নিয়মিত পড়াশোনা চালু হলে উস্তাযে মুহতারাম রামাযানেও মারকাযে আসেন। প্রতি মাসে ১/২ বার মারকাযে সময় দেন। এই ধারাবাহিকতা চলতে থাকে।

রামাযানের পর যখন হুযূর মারকাযে আসেন তখন থেকে তালিবুল ইলমগণ যাতে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন মাশওয়ারা নিতে পারে এজন্য আমরা হুযূরকে আছর থেকে মাগরিব এই সময়টুকু তালিবুল ইলমদের জন্য বরাদ্দ দিতে অনুরোধ করি। হুযূর তা কবুল করেন। তালিবুল ইলমগণও আগ্রহের সঙ্গে এই সুযোগ গ্রহণ করে।

হুযূরের আগমণ উপলক্ষে আমরা উস্তাযদের নিয়ে মজলিস করি। হুযূর বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলেন। সকল মজলিসেই হুযূর আমাদেরকে মাওলানা যুবায়ের সাহেবের নির্ধারিত কিছু কিতাব পড়তে উৎসাহ দিতে থাকেন। কয়েক মজলিসের পর তো এমন হলো যে, কয়েকটি কিতাবের নাম উল্লেখ করে বললেন, সকল উস্তাযকে এই কিতাবগুলো হরফান হরফান পড়তে হবে। এটা জরুরি। আমরা এ বিষয়কে একটু শিথিল দৃষ্টিতে দেখতে অনুরোধ করি। তখন আর্থিক অবস্থা আমাদের খুব ভালো ছিলো না। এটা উল্লেখ করেও হুযূরকে বলি। হুযূর রাজি হলেন না। তখন মাদরাসা থেকে কিতাব নিয়ে এসে উস্তাযগণের ওযীফা থেকে পরে কর্তন করে কিতাবের মূল্য রেখে দিতে হুযূর ফয়সালা দেন। এমনই হলো। ঢাকা থেকে হুযূরের মাধ্যমে কিতাব আনা হলো।

এদিকে তালিবুল ইলমদেরকেও বিভিন্ন সময় এই কিতাবগুলো পড়তে নির্দেশ দিতে থাকেন। কখনও বা দরসে, কখনও বা আসরের পর ব্যক্তিগত মাশওয়ারায়। কিছুদিন পরই আমরা এর কিছু প্রতিক্রিয়া তালিবুল ইলমদের মাঝে দেখতে পাই।

এরপর ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের ২ তারিখ। মারকাযুল হিদায়া সিলেট ও জামিয়াতুল উলূম আশ-শারইয়্যাহ সিলেটের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ইলমী মুসাবাকার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে বরেণ্য উলামা-মাশায়েখদের সঙ্গে উস্তাযে মুহতারামও ছিলেন বিশেষ অতিথি হিসেবে। সেই অনুষ্ঠানে ফুআদ সাহেব হুযূর অসুস্থতার কারণে মৌখিক বক্তব্য দিবেন না বলে আমাদেরকে জানান। সেই হিসেবে একটি লিখিত বক্তব্য তৈরি করে দিলে আরেক মাওলানা তা পড়ে শুনান। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সময়ে দর্শক-শ্রোতাদের আগ্রহের প্রতি লক্ষ করে আমরা হুযূরকে ১/২ মিনিট কথা বলতে অনুরোধ করি। হুযূর সম্মতি প্রকাশ করে মোটামুটি লম্বা বক্তব্য প্রদান করেন। সেখানে ইলমী মুসাবাকা প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে ভিন্ন কিছু কথা আলোচনা করেন। পরবর্তীতে আহলে ইলমদের থেকে এটা নিয়ে আমাদের কাছে বিভিন্ন প্রশ্ন আসতে থাকে।

এদিকে মাওলানা যুবায়ের সাহেবের বই নিয়ে ইতোমধ্যে আহলে ইলমদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
এর কিছুদিন পর মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়া থেকে মাওলানা যুবায়ের সাহেবের বইয়ের ব্যাপারে আবনাউল মারকাযের উদ্দেশ্য করে একটি ওয়াযাহাতনামা আমাদের হাতে আসে, যা অনলাইনেও তখন প্রকাশ পায়।

তখন আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম এবং কিছু তালিবুল ইলম আমাদের কাছে প্রশ্ন করতেও শুরু করেন। মাওলানা যুবায়ের সাহেবের বই পড়তে ফুআদ সাহেব আমাদেরকে বাধ্য করেন। অপরপক্ষে মারকাযুদ দাওয়াহ আলইসলামিয়ায় অবস্থান ভিন্নরকম। এক্ষেত্রে আমরা কী করবো?

মূলত তখনই মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহুর বিষয়টি নিয়ে আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে হয়। এজন্যই ফুআদ সাহেবের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করে সমাধানে যেতে আমরা হুযূরের সঙ্গে আলোচনা করতে উদ্যোগী হই। সে হিসেবেই এই তৎপরতা।

তো সেদিন বৃহস্পতিবার রাতে মাদানীনগর পৌঁছে ফুআদ সাহেব হুযূরের কাছ থেকে আমরা অনুমতি গ্রহণ করি এই বলে যে, হুযূর! আপনার সঙ্গে আমরা আগামীকাল একটি জরুরি বিষয়ে আলোচনা র জন্য বসতে চাই। বৈঠকে মারকাযুদ দাওয়াহ’র মাওলানা সাঈদ সাহেবও উপস্থিত থাকবেন। হুযূর অনুমতি দেন এবং জায়গা ঠিক হয় হুযূরের বাসায়ই বসা হবে। পরদিন শুক্রবার বাদ ফজর আমরা হুযূরের বাসায় যাই। সকালের নাস্তাও হুযূরের বাসায় করি। সাঈদ সাহেবও তাশরীফ আনেন। নাস্তার পর হুযূরের বাসার ৯ তলার ছাদে আমরা চারজন বৈঠকে বসি।

তিন
বৈঠকের আলোচনা ও ফলাফল

বৈঠক ৫/৬ ঘণ্টা ব্যাপী হয়েছিলো। সকাল থেকে জুমার আযান পর্যন্ত। ৫/৬ ঘণ্টার সব কথা তো লিখে বলা মুশকিল। মূল কথাগুলো সংক্ষেপে বলছি।

মারকাযুল হিদায়ার আসাতিযায়ে কেরাম ও তালিবুল ইলমদের হালত, সিলেটের আহলে ইলমদের বিভিন্ন প্রশ্ন এবং সর্বশেষ মারকাযুদ দাওয়াহর ওয়াজাহাতনামার বিষয় উল্লেখ করে আমরা এই মুহূর্তে কী করবো পরামর্শ চাই।
হুযূর বললেন, এটা তো এতো সমস্যার কিছু না, প্রত্যেকে আপন অবস্থানে কাজ করুক। আর যুবায়ের সাহেবের বই পড়তে আমি বলেছি, এটা যদি সমস্যা হয় তাইলে আমি আর পড়তে বলবো না।
আমরা বললাম, হুযূর! এতদিনে তো অনেক কিছুই হয়ে গেছে। তবুও আমরা এখন চাই, আপনি যেহেতু আরবী ভাষা ও সাহিত্যের মানুষ। সারাজীবন এর পেছনেই সময় দিয়েছেন, আল্লাহর ওয়াস্তে আপনি এই বিষয়েই সীমাবদ্ধ থাকুন। ফিকহ বিষয়ে আপনি কোনো কথা না বললেই ভালো। তিনি এটা মানলেন না। বললেন, আমি আরবী ভাষা নিয়ে কাজ করেছি বলে অন্য বিষয়ে কথা বলবো না, এটা হতে পারে না। আমি আমার বুঝমত কথা বলেই যাবো।
(যুবায়ের সাহেবের বইয়ে উল্লিখিত বিভিন্ন বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে। জিহাদ, গণতন্ত্র, তাগুত ইত্যাদি বিষয় নিয়েও কথা হয়েছে।)
এক পর্যায়ে আমরা বললাম, হুযূর! আপনি মারকাযে নিয়মিত আসেন, আমরা এটা মনেপ্রাণে চাই। তবে আমাদের একটা অনুরোধ, এসব বিষয়ে মারকাযে দরসে বা দরসের বাইরে কোনো কথা বলবেন না। শুধু নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত বিষয়ে দরস দিবেন। হুযূর এটাও মানলেন না। বললেন, ‘আমি শুধু আরবী ভাষা পড়ানোর জন্য কোথাও যাবো না। আমি গেলে আমার কাজ নিয়েই যাবো।’
পরে আমরা বললাম, হুযূর! আপনি আমাদের উস্তায। আবদুল মালেক সাহেবও আমাদের মুরব্বি। এই যে একটা বৈপরীত্য দেখা দিয়েছে, এটা এক জায়গায় বসে মুক্ত আলোচনা করলে সুন্দর সমাধান হয়ে যাবে বলে আমরা আশা করি। হুযূর খুব আগ্রহের সঙ্গে বললেন, আমি যেকোনো জায়গায় আলোচনায় বসতে রাজি আছি।
এক্ষেত্রে আমরা বললাম, হুযূর! তাইলে আমরা মধ্যস্ততা করে মারকাযুদ দাওয়ায় বসার পরিবেশ করি। আবদুল মালেক সাহেবকেও উপস্থিত রাখার ব্যবস্থা করলাম। সাঈদ সাহেব হুযূর আশা করি আমাদের সহযোগিতা করবেন। আপনি কষ্ট করে একটু মারকাযুদ দাওয়ায় তাশরিফ আনবেন।
তখন তিনি বললেন, ”আবদুল মালেক সাহেব এমন কী হয়ে গেছেন যে আমি তার কাছে যাবো? তাঁর প্রয়োজন হলে এখানে আসবেন। মাওলানা, “উনাদের সাথে এই ইখতিলাফ ছোটোখাটো কোনো ইখতিলাফ না। এটা ঈমান-কুফুরের ইখতিলাফ।”

হুযূরের এই বক্তব্যে আমরা একেবারে আশাহত এবং মর্মাহত হয়ে পড়লাম। এই কথার প্রেক্ষিতে কী বলবো বুঝতে পারছিলাম না। পরিবেশ নিস্তব্ধ হয়ে গেলো।
সর্বশেষ সাঈদ সাহেব কথা বললেন ফুআদ সাহেবকে উদ্দেশ্য করে। বললেন, ‘দেখুন, তারা নতুন প্রতিষ্ঠান করেছেন। প্রথমেই যদি ওরা হোঁচট খায়, তাইলে সামনে চলা কঠিন হবে। আপনি আপনার চিন্তাফিকির নিয়ে থাকেন বা যাই করেন, আপনি এতটুকুতে একমত হতে পারেন কি না দেখেন। এই যে ওযাহাতনামার এই অংশটুকুর সাথে একমত হতে পারেন কি না?’
আমরাও অনুরোধ করলাম বারবার। হুযূরকে রাজি করানো যাচ্ছে না। শেষ পর্যায়ে বললেন, ঠিক আছে। আমি এতটুকুতে একমত। বলে একটা রেখা টানলেন। আমরা বললাম, হুযূর যে একমত এখানে একটা দস্তখত দিয়ে দেন। আমরা আমাদের উস্তাযগণকে দেখাতে পারবো। তারাও আশ্বস্ত হতে পারবেন। কাগজে দাগ টেনে হুযূর দস্তখত করলেন। মজলিস শেষ হলো।
(তিন পৃষ্ঠার ওযাহাতনামার শেষ পৃষ্ঠায় মুফতী দেলওয়ার সাহেবের বক্তব্য থেকে নিচ পর্যন্ত)

বাদ জুমা ৩ টার দিকে আমরা সিলেটের উদ্দেশে বাসে চড়ে বসলাম। মনে কিছুটা স্বস্তি এজন্য যে, পুরোপুরি না হলেও কিছুটা হলেও সফলতা আসছে। আমাদের বহনকারী বাস যখন শায়েস্তাগঞ্জ পাড়ি দিচ্ছে, তখন উস্তাযে মুহতারাম ফুআদ সাহেবের ফোন। সালাম বিনিময়ের পর হুযূর বললেন, ‘নূরুযযামান শুনো! আমি কাগজে যে বিষয়ে একমত হয়ে দস্তখত করেছিলাম তা থেকে আমি রুজু করলাম। আমি এই কথার সাথে একমত এটা কাউকে বলার অনুমতি নেই। আমি রুজু করলাম’।
শেষ আশাটুকুও মুহূর্তেই শেষ হয়ে গেলো।

সফর থেকে ফিরে এসে সিলেটে আমাদের পরিচিত ফুআদ সাহেব হুযূরের ছাত্রদেরসহ আরও কয়েকজনকে বিষয়টি আমরা অবগত করেছি। হুযূর যে শব্দে বলেছেন এই শব্দেই। যাদেরকে বলেছি তারা হলেন মুফতি রাশেদ আহমদ, মাওলানা তাফাজ্জুল হক, জামিআতুল উলূম আশ শারইয়্যাহ’র মুহতামিম মুফতি আবু মুহাম্মদ ইয়াহইয়া, নাযিমে তালীমাত মাওলানা মুশতাক আহমদ চৌধুরী, আম্বরখানা জামে মসজিদের ইমাম মুফতি জিয়াউর রহমান সহ কয়েকজন।

এই ছিলো মূল কাহিনী। এমন পরিস্থিতিতে হুযূরকে মারকাযুল হিদায়ায় আনা আমরা সমীচীন মনে করে নি। মাঝেমধ্যে ফোনে যোগাযোগ রক্ষা করতাম। উস্তায হিসাবে ভক্তি, শ্রদ্ধা বজায় রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু চিন্তাগত বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দেওয়ায় সামনে অগ্রসর হওয়ার কোনো সুযোগ আমাদের ছিলো না।
প্রিয় পাঠক! বিষয় টি যদি একেবারে হালকা, তুচ্ছ কিছু হতো তাহলে তো ৫/৬ ঘন্টার বৈঠকের পর একটা সমাধান তো আসতো। কিন্তু তা তো হলো না।
চার.
ফোন রেকর্ড প্রসঙ্গ

গতকাল থেকে অনেকেই একটি ফোন রেকর্ড ইনবক্সে পাঠাচ্ছেন। সেখানে একজন প্রশ্নকারী ফুআদ সাহেব হুযূরকে আমার নাম উল্লেখ করে বলেছেন, অমুক বলেছেন, আপনি নাকি মুফতি তাকী উসমানী ও আবদুল মালেক সাহেবকে কাফের মনে করেন। (বুঝতে কষ্ট হচ্ছে না যে, পরিকল্পিতভাবে এটি ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।)

এ বিষয়ে আমার প্রথম কথা হলো, কারো কোনো বক্তব্য প্রচার করার পূর্বে জরুরি হলো এটা তাহকীক করে নিশ্চিত হওয়া। কারণ অনেক সময় তা’বীরের ব্যবধানে মূল বক্তব্যে পরিবর্তন এসে যায়।
যেমন ওই অডিওতে মুহতারাম প্রশ্নকারী হুযূরকে যে শব্দে প্রশ্ন করেছেন, আমি ১০০% নিশ্চিত হয়েই বলছি, আমি ‘এই এবারতে’ কোনো বক্তব্য কারো কাছে নকল করি নি। বা হুযূরও এভাবে কারো নাম নিয়ে (অমুক কাফের) বলেন নি। আমি ঐ বক্তব্যই বলেছি যা হুযূর আমাদের সাথে বৈঠকে বলেছেন। যার বিস্তারিত বিবরণ উপরে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ব্যক্তি সম্পর্কিত প্রশ্ন এগুলো কিছু ভাইদের অতিরঞ্জন মনে হচ্ছে, যা তারা হয়ত মূল মতন থেকে ইস্তেমবাত করে আমার দিকে মনসূব করছেন।

আরেকটু অগ্রসর হয়েই আমি বলতে চাই, আমরা তিনজন স্বাক্ষীর (মাওলানা সাঈদ সাহেবের সাথে এ বিষয়ে গতকাল কথা হয়েছে। রেকর্ড আছে, প্রয়োজন হলে দিবো।) বক্তব্য যদি বিশ্বাস না হয়, আর হুযূর মূল মাসআলায় এখন নতুন করে ঘোষণা দেন যে, আমি এমনটা বলি নি এবং এমনটা আমার বিশ্বাসও নয়। তাহলে তো আরো অনেক ভালো হয়। আমরাও এমনটা চাই যে, হুযূর আমাদের উস্তাদ, আমাদের শ্রদ্ধাস্পদ। আমরা যদি ভুল করে থাকি হুযূরের পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেবো। তবুও যেনো হুযূর পরিষ্কারভাবে (ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে নয়) এই ঘোষণা দিয়ে দেন যে, ‘ওদের দাবী ভুল, মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবদের সাথে আমার ঈমান-কুফরের কোন এখতেলাফ নেই’।

আর যদি এমনটা না হয় তাহলে আপনাদের খেদমতে বিনীত অনুরোধ, আল্লাহর ওয়াস্তে নিজ নিজ নজরিয়া নিয়ে মেহনত করুন। কাউকে হেয় করার চেষ্টা করবেন না। ইলমী বিষয়ে ভিন্নমত থাকতেই পারে। মূল মাসআলা যেটা আপনাদের কাছে সুস্পষ্ট, যেটা নিয়ে শত শত লেখা আপনাদের কলমে আছে। বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো দরকার নেই।

প্রশ্নকারী (অডিওর শেষাংশে) নাম ছাড়া একজন ইমাম সাহেবের বরাত দিয়েছেন। নির্ধারিতভাবে তো বলতে পারছি না কোন ইমামের কথা তিনি বলেছেন। তবে আলামত থেকে যদ্দুর বুঝেছি,এই সন্দেহ দূর করতে ঐ ইমাম সাহেবের কাছে এবিষয়ে জানতে চাইলে তিনি পরিষ্কার বলে দিলেন যে, আমার নামে এমন কথা তিনি বলেন নি।

(এখানে কোন কোন বিষয় মুখতালাফ ফীহি এটা সচেতন আসলে ইলম অবশ্যই অবগত আছেন। বিস্তারিত বলার জরুরত নেই।)

আজ বাদ যুহর উস্তাযে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুআদ হাফিযাহুল্লাহুর সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা হয়েছে।হুজুরকে জিজ্ঞেস করেছি কবে এই ফোনালাপ হয়েছে, এবং কার সাথে হয়েছে?
হুজুর বলেছেন এই ৫/৬ দিনের মধ্যে সিলেট থেকে মিনহাজুস সিরার নামে একজন ফোন করে এই প্রশ্ন করেছে।
তবে হুযূর এখনও আপন অবস্থানে বহাল আছেন। কারও নাম উল্লেখ করে ‘অমুক কাফের’ এভাবে না,
বরং ওই মুখতালাফ ফীহ মাসআলায় যে ঈমান-কুফুরের ইখতিলাফ এটা তিনি এখনও বলেন। (কারও প্রয়োজন হলে আজকের ফোনালাপের অডিও রেকর্ড নিয়ে শুনতে পারেন।)
প্রিয় পাঠক, এবার ইনসাফের আদালতে আপনারাই বিচার করুন। আমার উপর অভিযোগ দেয়া হচ্ছে ‘আমি আমার উস্তাদের নামে মিথ্যা বলে বেড়াচ্ছি।
এবার আপনারাই বলুন এই পরিস্থিতিতে আমার কী করণীয় রয়েছে।
পরিশেষে আমার প্রিয় ভাইদের বলবো, যদি আপনাদের সাথে বড় কোন বিষয়ে এখতেলাফ না থাকে , তাহলে এভাবে কাঁদা ছোড়াছুড়ি না করে আসুন,এক জায়গায় বসে বিষয়গুলো মুযাকারা করে সমাধানে যাই।
আর যদি বিষয় টি সমাধানযোগ্য না মনে করেন,
তাহলে স্পষ্ট করে নিজেদের নজরিয়া পেশ করুন।
আল্লাহর ওয়াস্তে উম্মতের এই কঠিন সময়ে ছোট খাটো বিষয় নিয়ে এখতেলাফ করা সমীচিন নয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দ্বীনের সহীহ বুঝ দান করুন। আমীন।

(যাদের কাছে সেই অডিও রেকর্ডটি পৌঁছেছে বলে আপনি জানেন, তাদেরকে এই পোস্টের কমেন্টে উল্লেখ করে এই লেখাটি পড়ার সুযোগ করে দিতে অনুরোধ রইলো।)