ভ্রান্তির বেড়াজালে কবর জিয়ারত ও তার সঠিক রাজপথ

প্রকাশিত: ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ, জুন ২১, ২০২০

ভ্রান্তির বেড়াজালে কবর জিয়ারত ও তার সঠিক রাজপথ

সাইদুজ্জামান আল হায়দার

প্রতিটি মানুষকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।
প্রতিটি প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে তারপর আমার কাছেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। আন-কাবুত, ২৯/৫৭
আর মৃত্যুর যন্ত্রণা যথাযথই আসবে, যা থেকে তুমি অব্যাহতি পাওয়ার চেষ্টা করতে। ক্কাফ, ৫০/১৯
তোমরা যেখানেই থাক না কেন মৃত্যু তোমাদের নাগাল পাবে, যদিও তোমরা সুদৃঢ় দুর্গে অবস্থান কর। আন-নিসা, ৪/৭৮

মৃত্যুর পর মানুষের প্রথম ঠিকানা কবর। কবর কারও জন্য ফুলের বিছানা কারও জন্য নরক। তবে কবরের আযাব বন্ধ হয় জীবিতদের দোয়ায়। এমনটিই বলা হয়েছে। মৃত মানুষ পৃথিবীতে সব কিছু রেখে যান। তবে কিছু কাজ মারা যাওয়ার পরও অব্যাহত থাকে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা) বর্ণনা করেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সমস্ত আমলের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি আমলের দরজা বন্ধ হয় না।
১. ছদকায়ে জারিয়া,
২. যদি কেউ এমন সন্তান রেখে যায়, যে সন্তান মা-বাবা জন্য দোয়া করবে,
৩. এমন দীনি শিক্ষা রেখে যায়, যার দ্বারা মানুষ উপকৃত হতে থাকে। (মুসলিম)
আবু হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত,
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম তাঁর মায়ের কবর জিয়ারত করে এত কাঁদলেন যে, তাঁর কান্না দেখে আশপাশের সবাই কাঁদল। তারপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াছাল্লাম বললেন, ‘আমি আমার প্রভুর কাছে অনুমতি চেয়েছি আমার মায়ের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার। কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হয়নি। অতঃপর অনুমতি চাই মায়ের কবর জিয়ারত করার জন্য। এবার আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। অতএব, তোমরা কবর জিয়ারত কর। কেননা এটা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়।’ (মুসলিম, আবু দাউদ)
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে কবর যিয়ারত তিন প্রকার। যথাঃ
১. শিরকী- যিয়ারত
২. বিদআতী-জিয়ারত
৩. ছুন্নতী- জিয়ারত

শিরকী -জিয়ারত হল কবরবাসির কাছে কিছু চাওয়া, এমন বিশ্বাস পোষণ করা যে কবরে শুয়ে থাকা মাইয়াত বা মৃত ব্যক্তি তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি দিতে পারবেন। এটি চরম গর্হিত ও না জায়েজ কাজ এবং শিরক, যা ইসলামে সবচেয়ে বড় অপরাধ।
আল্লাহ বলেন:
“নিশ্চয়ই শিরক একটি মস্ত বড় অন্যায়” (সুরা লোকমান: ১৩)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা তার সাথে শিরক করার অপরাধ ক্ষমা
করবেন না। এ ছাড়া অন্য সকল গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে
দিবেন” (সুরা নিসা: ৪৮)
“আর যদি তারা শিরক করে তাহলে তাদের সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে।” (সুরা আনআম: ৮৮)
আল্লাহ্‌ তায়ালা আরও বলেন,
“আর নির্দেশ হয়েছে আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না, যে তোমার ভাল করবে না মন্দও করবে না। বস্তুতঃ তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে তখন তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” (সূরা ইউনুস: ১০৬)

বিদআতী- জিয়ারত হল আল্লাহ্‌ তায়ালার কাছেই চাওয়া কিন্তু এই বিশ্বাস পোষণ করা যে কবরের পাশে গিয়ে চাইলে বা মৃত ব্যক্তির অছিলা করে চাইলে দুয়া তাড়াতাড়ি কবুল হবে বা দুয়া কবুল হওয়ার নিশ্চয়তা বেশী থাকবে। যেমনঃ কেউ যদি মনে করে যে সিলেটে শাহজালালের (রাহেমাহুল্লাহ) কবরে গিয়ে চাইলে দুয়া কবুল হবে বা এতে মৃত ব্যক্তির আমলের গুনে বরকত হবে যা ঘরে বা মসজিদে বসে চাইলে পাওয়া যাবে না তাহলে এরকম যিয়ারতও ইসলামে না জায়েজ এবং বিদআত।
“তোমরা (দ্বীনের) নব প্রচলিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাক। কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয় বিদআ‘ত এবং প্রত্যেক বিদআত ভ্রষ্টতা”। [সুনান আবু দাউদ ৩৯৯১, সুনান আত-তিরমিযী ২৬৭৬]

বরং আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেছেন,
…আমি রয়েছি সন্নিকটে। যারা প্রার্থনা করে, তাদের প্রার্থনা কবুল করে নেই, যখন আমার কাছে প্রার্থনা করে। কাজেই আমার হুকুম মান্য করা এবং আমার প্রতি নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করা তাদের একান্ত কর্তব্য। যাতে তারা সৎপথে আসতে পারে। সূরা বাকারাহ ১৮৬

যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে রেখেছে এবং বলে যে, আমরা তাদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।… আল্লাহ মিথ্যাবাদী কাফেরকে সৎপথে পরিচালিত করেন না। সূরা আল-যুমার ৩

তারা কি আল্লাহ ব্যতীত সুপারিশকারী গ্রহণ করেছে? বলুন, তাদের কোন এখতিয়ার না থাকলেও এবং তারা না বুঝলেও? সূরা আল-যুমার ৪৩
কবরবাসি না কিছু শুনতে পারে না বুঝতে পারে! তাদের কাছে চাওয়া বা তাদের উছিলা হিসেবে গ্রহন করা নিছক বোকামি।

প্রসঙ্গত, শাহজালাল (রাহেমাহুল্লাহ), কোন পীর বা যে কোন মানুষের কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে গমন করা যাবে না।
“তিন মসজিদ ব্যতীত অন্য কোথাও সফর করা যাবে নাঃ মসজিদে হারাম, আমার এ মসজিদ ও মসজিদে আকসা”। (বুখারি ২৮১)

সর্বশেষ হল ছুন্নতী-জিয়ারত। এই যিয়ারত হল শুধুমাত্র ছালাম দেয়া ও দুয়া করা। দুয়াটি হলঃ-
«السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ، مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ، [وَيَرْحَمُ اللَّهُ الْمُسْتَقدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتأْخِرِينَ] أَسْاَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ»
উচ্চারণঃ (আচ্ছালা-মু আলাইকুম আহলাদ্দিয়ারি মিনাল মু’মিনীনা ওয়াল মুছলিমীনা, ওয়াইন্না ইনশা-আল্লা-হু বিকুম লা-হিকুনা, ওয়া ইয়ারহামুল্লাহুল মুছতাক্বদিমীনা মিন্না ওয়াল মুছতা’খিরীনা, আছআলুল্লাহা লানা ওয়ালাকুমুল ‘আ-ফিয়াহ)।
অর্থঃ “হে গৃহসমূহের অধিবাসী মুমিন ও মুসলিমগণ! তোমাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আর নিশ্চয় আমরা ইনশাআল্লাহ আপনাদের সাথে মিলিত হবো। [আল্লাহ আমাদের পুর্ববর্তীদের এবং পরবর্তীদের প্রতি দয়া করুন।] আমি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করি।”
[মুসলিম ২/৬৭১, নং ৯৭৫; ইবন মাজাহ, ১/৪৯৪, আর শব্দ তাঁরই, নং ১৫৪৭; বুরাইদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে। আর দু ব্রাকেটের মাঝখানের অংশ আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার হাদীস থেকে, যা সংকলন করেছেন, মুসলিম, ২/৬৭১, নং ৯৭৫।]
এই ছুন্নতী -জিয়ারতের উদ্দেশ্য দুটি। যথাঃ
১. নিজের উপকার
২. মাইয়িত বা মৃত ব্যক্তির উপকার
* নিজের উপকার হচ্ছে, কবর জিয়ারতের মাধ্যমে পরকালের কথা স্মরণ হবে।
* মাইয়িতের উপকার যদি উনি আজাবে থাকেন তবে জিয়ারতের বরকতে আজাব হালকা হবে আর যদি আরামে থাকেন তাহলে আরাম বৃদ্ধি হবে।
বিশুদ্ধ মতে মহিলাদের জন্য কবর জিয়ারত করা নাজায়েজ ও গুনাহের কাজ।

 

লেখক: কলামিস্ট ও অলেমে দ্বীন। 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ