করোনা মুসল্লি বনাম ওলামায়ে কেরাম

প্রকাশিত: ১:২২ অপরাহ্ণ, মে ২৮, ২০২০

করোনা মুসল্লি বনাম ওলামায়ে কেরাম

আব্দুল্লাহ সালমান

মানুষ যখন গোনাহের সাগরে নিমজ্জিত, সত্যকে ভুলে রবের নাফরমানিতে লিপ্ত, পাপাচার আর অনাচার যখন মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী, চীন-মিয়ানমার-ভারতসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ যখন মুসলিম নিধনে ব্যাস্ত, বাংলাদেশ-পাকিস্তান-মিশরসহ পৃথিবীর মুসলিমপ্রধান দেশ যখন আল্লাহ ও রাসুলের ইজ্জত লুণ্ঠনে মত্ত, সৌদিআরবের মতো দেশ যখন শরিয়তবিরোধী আইনের আশ্রয় নিয়ে দশ হাতে টাকা কামানোর চিন্তায় মগ্ন। তখনই আল্লাহ করোনাভাইরাস নামক চুড়ান্ত এক গযবকে পাঠালেন ভূখণ্ড শাসন করার জন্যে। খোদার পাঠানো শাসককে রোধ করার সাধ্য যে কারও নেই সেটা প্রমাণিত হলো আমেরিকা-রাশিয়া-চীন-ভারতের মতো পরাশক্তির অসহায়ত্বের মাধ্যমে। আল্লাহ দেখিয়ে দিলেন তিনি কীভাবে নিমিষেই শেষ করে দিতে পারেন সকল শক্তি। দেখিয়ে দিলেন পারমানবিক অস্ত্রগুলোও কীভাবে অকৃতকার্য হয় অদৃশ্য একটি ভাইরাসের কাছে। বিশ্বে করোনাভাইরাসের তাণ্ডব ভুলার নয়। যারা বেঁচে থাকবেন আর যারা আগামিতে আসবে সবার জন্যে একটি শিক্ষা আর ভয়চিহ্ন হয়ে থাকবে এই করোনা।
আল্লাহ তা’লা বান্দাদের সবসময়ই সুযোগ দিতে থাকেন পথে ফিরে আসার। সে হিশেবে এ মহামারি থেকেও হয়তো আমরা রক্ষা পাব। আস্তে আস্তে করোনার প্রকোপ কমতে শুরু করেছে। দোয়া করি আল্লাহ যেন আমাদের ক্ষমা করেন এবং করোনা থেকে মুক্তি দান করেন।
এবার আসি মূল কথায়;
বাংলাদেশে যখন করোনার প্রভাব ক্রমেই বিস্তার হচ্ছিল তখনই সরকার সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা শুরু করে। সরকার কর্তৃক ঘোষণা দেওয়া হয়, পাঁচজনের অধিক মসজিদের জামাতে না থাকার। স্বভাবতই আমরা মসজিদে যাওয়া বন্ধ করে ঘরে পরিবারের সদস্যরা মিলে জামাতে নামাজ আদায় করা শুরু করি। কিন্তু আমাদের না যাওয়াতে কি মুসল্লি কমে গেছেন? না, খবর নিয়ে দেখা যায়- স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে আট/দশগুণ মুসল্লি বেড়ে গেছেন। শুধু আমাদের মসজিদেই যে এমন তা কিন্তু নয়, প্রায় এলাকার একই অবস্থা। কোনো কোনো মসজিদে নিচের তলায় পাঁচজন দেখা গেলেও উপরের তলা ভর্তি; এমনও দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যাই হোক, ভাবার বিষয় হচ্ছে এতো মুসল্লি কোথা থেকে? উত্তর খুবই সহজ; করোনার ভয়ে।
ভালো কথা। আযাব এসেছে, রবের কাছে ক্ষমা চাইতেই হবে। ভাবলাম, সবাই তাওবা করে নামাজী হয়ে গেছে আলহামদুলিল্লাহ।
হঠাৎ একদিন কানে আওয়াজ এল- কিছু মুসল্লি আলেমদের বিরোধিতা করছেন। বলে বেড়াচ্ছেন, “হুজুরদের ঈমান এই পর্যন্তই, করোনার ভয়ে মসজিদে আসা বন্ধ হয়ে গেছে।”
সামনে এসে কেউ বলবে এমন সাহস তো নেই বললেই চলে। তাই আমিও ছেড়ে দিলাম বিষয়টা। যত দিন যাচ্ছিল ততই বেশি কথাগুলো শোনতে পারছিলাম। আমার কয়েকজন বন্ধুও আমাকে বলেছে যে, তারাও নাকি এসব অপপ্রচারের স্বীকার। সবাইকে বলছিলাম, কাওকে কিছুই বলার দরকার নেই, সময় সবই বলে দেবে। তবে কেউ যদি সরাসরি প্রশ্ন করে তাহলে শুধু বলো, “আমরা করোনার ভয়ে নামাজ পড়ি না, রবের ভয়ে পড়ি। করোনাকে ভয় করি আযাব হিশেবে আর আল্লাহকে ভয় করি মালিক হিশেবে।”

তখন আমরা শরিয়তকে ফলো করছিলাম যে, এই পরিস্থিতিতে শরিয়ত আমাদের মসজিদে না গিয়ে বাড়িতে নামাজ আদায় করার অনুমতি দেয় কি না। দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমরা সরকারের সিদ্ধান্তকে মেনে নিয়েছেন নিশ্চয় শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক না হওয়ার ফলেই। তাই বাড়িতে জামাত আদায় করেছি। আইনের প্রতি যে আমরা শ্রদ্ধাশীল সেটাও প্রমাণ হলো আর সঠিক নিয়মে নামাজও আদায় করতে পেরেছি। এখন মসজিদে যেতে কোনো বাধা নেই, তাই আবারও যাচ্ছি।
অন্যদিকে যারাই এমন কথা বলেছিলেন- তাদের মধ্যে অধিকাংশই করোনা-মুসল্লি, মানে করোনায় ভয়ে নামাজী। আগেও তারা নামাজী ছিল না পরেও না।
হয়তো কথাগুলো উদ্ভট লাগছে, কিন্তু এটাই সত্যি। কারণ, যখন মসজিদকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো, তখনই সেইসব মুসল্লি গায়েব। আবারও মসজিদ ফিরে গেল ৫/৭ জন মুসল্লিতে। সবাই ভাবতে শুরু করেছে করোনা তো চলে গেছে, তাই সবকিছু খোলে দেওয়া হচ্ছে। তাহলে আর নামাজ ছাড়লেও সমস্যা নেই।
মূলত এ জন্যেই বলেছিলাম করোনা-মুসল্লি। করোনার ভয়েই তারা নামাজে প্রতি মনোযোগী হয়েছিল। এতই পরহেজগার হয়েছিল যে, লুঙ্গি খোলে পাগড়ি বাঁধা শুরু করে দিয়েছিল। মসজিদে এসে নামাজ পড়ে সওয়াব বেশি পাওয়ার বদলে ওলামায়ে কেরামের সমালোচনা করে গোনাহ যে কামাই করছে সেটা টেরই পায় নি।
কথাগুলো সরাসরি বলার মতো সুযোগ তৈরি হয় নি, তাই এখানে বললাম। যারা যেখানেই এমন কাজে লিপ্ত ছিলেন তাদের জন্যে আমার লেখাটা।
আগামিতে আলেমদের বিরুদ্ধে কথা বলার আগে একবার হলেও ভাববেন। আল্লাহর ইশারায় ওলামায়ে কেরাম চলেন, মালিকের জন্যেই চলেন, রবের ভয়ে শির নত করেন। আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
انما یخشی الله من عباده العلماأ-
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহর বান্দাদের মধ্য থেকে উলামায়ে কেরামই আল্লাহকে ভয় করেন। (সুরা ফাতির-২৮)
রাসুল (স.) বলেন-
ومن لم یبجل عالمینا فلیس منا
যে ব্যক্তি আলেমদের সম্মান করল না তার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে-
اكرمواالعلماأ فانهم ورثۃ الانبیاأ
ওলামায়ের কেরামের সম্মান কর, কেননা এরা নবিদের উত্তরাধিকারী ও নায়েব। (কানযুল উম্মাল ১০/১৫০)

এ আয়াত ও হাদিস বলে দেয় আল্লাহর প্রিয় বান্দা, ওলি-আওলিয়া আলেমদের মধ্য থেকে। তাই তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে। আর তাদের বিরুদ্ধবাদীর ব্যপারে হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ বলেন-
من عاد لی ولیاََ فقد اذنته باالحرب-
অর্থাৎ, যে আমার ওলির বিরোধিতা করে তার সঙ্গে আমার যুদ্ধ ঘোষণা। (সহিহ বুখারি ২/৯৬৩)
যদি আল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধ করার মতো শক্তি আর সাহস থাকে তাহলে আবার ওলামায়ে কেরামের প্রতি অসদাচরণ করবেন।
আর আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আগে করোনা নির্মম আক্রমণের কথা ভেবে দেখবেন। পুরো বিশ্ব থমকে আছে, অসহায়ের মতো উপরের দিকে চেয়ে আছে সবাই। যুদ্ধের জন্যে আর কিছুই দরকার নেই, শুধু করোনার মতো অদেখা একটি ভাইরাসই যথেষ্ট।
আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক বুঝ দান করুন। হকের উপর থাকার তাওফিক দিন। আপনার হুকুম এবং নবি (স.)-এর দেখানো পথে চলার শক্তি-সামর্থ্য দান করুন। আমিন।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, জনকল্যাণ ২৪

সম্পাদক, সীমান্তের আহ্বান

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ