তারাবিহ শেষ হয়েছে হাদিয়া বিতর্কটাও এবার শেষ হোক

প্রকাশিত: ১০:১৬ পূর্বাহ্ণ, মে ২৬, ২০২০

রশীদ জামীল

জায়েজ-নাজায়েজের গ্যাঁড়াকলে চিরেচেপ্টা হয়ে আছে ব্যাপারটি। সম্প্রতি মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরি এবং মুফতি আনোয়ার হোসাইন চিশতির বাক্যযুদ্ধের মধ্যদিয়ে বিষয়টি এখন ইতিবাচক অস্বস্থিকর পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে।

ইতিবাচক অথচ অস্বস্থিকর; কারণ, দুর্যোগপূর্ণ এই সময়ে এরকম একটি বিষয় নিয়ে দু’জন আলেমের অনলাইনে লোক হাসানো কর্মকাণ্ড অস্বস্থিকর হলেও ব্যাপারটিকে আমরা ইতিবাচকতার দৃষ্টিতেই দেখতে চাই। আমরা আশা করতে চাই বিজ্ঞ মুফতিগণ এবার একটু নড়েচড়ে বসবেন। আমরাও বছর বছর হাদিয়া-জনিত অস্বস্থিকর এই বিতর্ক থেকে নিস্তার পাবো।


প্রাজ্ঞ আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরি তারাবির হাফিজদের হাদিয়ার ব্যাপারে বরাবরই জিরো টলারেন্স নীতি অভলম্ভন করে থাকেন। ইতিপূর্বেও তিনি তাঁর বিভিন্ন বয়ানে তারাবির হাফিজদের হাদিয়া প্রদানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জানান দিয়ে এসেছেন। সম্প্রতি মুফতি চিশতি ওলিপুরির একটি বক্তব্যের রেশ ধরে পাল্টা অবস্থান জানান দেওয়ার পর ব্যাপারটি অনেকেরই নজর কেড়েছে। কাজটি করে তাঁদের কার ইমেজ কতখানি বাড়ল- আমরা জানি না। তবে এক অর্থে কিন্তু ভালোই হয়েছে। তাঁদের এই বিতর্কের কারণে বিষয়টি আলোচনার জন্য একটু হলেও গুরুত্ব পাচ্ছে। মন্দ কি!

ইলমি ব্যাপার-সেপার নিয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে মতানৈক্যে অবাক হওয়ার কিছু নেই- যদি সেটা দ্বীনের স্বার্থে হয়। দ্বীনি মাসাইলের ক্ষেত্রে ভিন্নমত মন্দ কিছু নয়- যদি সেটা নিজেকে জাহির এবং অন্যকে ঘায়েল করার মানসিকতা থেকে না হয়। দুই আলেমের বিতর্কে তাদের ভাষাগত অপরিপক্কতা বাদ দিলে এই বিতর্কে আশাবাদি হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। এবার একটা ফায়সালায় আসা যাবে হয়তো।


আমরা চাই জাতীয় পর্যায়ে মুরব্বি উলামায়ে কেরামের সরপরস্থিতে দেশের বিজ্ঞ মুফতিগণ একত্রে বসুন। কিতাবাদি সামনে নিয়ে কথা হোক। ফায়সালা বেরিয়ে আসুক। আর কাজটি হোক প্রোপারলি। প্রোপারলি বলতে ফতওয়া যেহেতু একটি স্পর্শকাতর বিষয়, এবং ফতওয়া দেওয়ার আগে একজন মুফতিকে কিতাব ছাড়াও আরো কতগুলো দিক বিবেচনায় রাখতে হয়- যা কেবল মুফতিগণই জানেন, তাই বিষয়টি মীমাংসার আলোচনায় মুফতিগণই মূখ্য আলোচক এবং ফায়সালা প্রদানকারী হোন।

সচরাচর যে ব্যাপারটি আমরা ঘটতে দেখি, বড় বড় বুযুর্গদের সবকিছুতে ইউজ করে তাঁদের সরলতা অথবা নজরআন্দাজির সুযোগে মধ্যসারি মওকার ফায়দা উঠিয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করিয়ে নেন। তারাবির হাদিয়ার বিষয়টি মীমাংসার ক্ষেত্রে আমরা চাই না এই সম্ভাবনার জানালাটি খোলা থাকুক।

একজন বড় বুযুর্গ হলেই জরুরি না যে তিনি বড় মুফতিও হবেন। আর শরঈ ফতওয়া সংক্রান্ত বিষয়াদি বড় বুযুর্গ এবং শীর্ষ আলেমদের বিষয় নয়। এটি মুফতিগণের মাঠ। তারাবিহ সংক্রান্ত স্পর্শকাতর এই বিষয়টি সুরাহার ক্ষেত্রে দেশের সিনিয়ার আলেমদের মিসইউজ না করে মুফতিদেরই যেন প্রাধান্য দেওয়া হয়।


এই সুযোগে জুনিয়র মুফতিদের অনেককে ইলমের ঝাপি নিয়ে অনলাইনে হাজির হতে দেখা যাচ্ছে। ‘হাতি ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়া বলে কতো জল’- কথাটি মনেহয় তাঁরা শুনেনি! উচিত ছিল শীর্ষ মুফতিগণের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা। উচিত ছিল জল ঘোলা করার কাজে সবাই অংশ গ্রহণ না করে ওয়েট এন্ড সি ফর্মূলা ফলো করা।

হ্যাঁ, দুই বিতার্কিত আলেমের প্রায়োগিক শব্দ চয়ন অস্বস্থি এবং আপত্তিকর ছিল। বাপের বেটা, মায়ের দুধ, ফেতনাবাজ, ধাপ্পাবাজ টাইপ শব্দ তাদের থেকে আমরা শুনতে চাইনি। এসব বলে তাঁরা তাদের অবস্থানকেই খাটো করেছেন। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারি। বলতে পারি, আল্লাহপাক তাদের সুমতি দিন। ওলিপুরিকে সুমতির পরিমাণটা যেন একটু বেশিই দেওয়া হয়।

কারণ-১. তিনি সিনিয়ার আলেম এবং অধিক গ্রহণযোগ্য।
কারণ-২. তিনি বরাবরই একটু বেশি আক্রমনাত্নক।


লকডাউন উঠে যাওয়ার পর মাসআলাটি মীমাংসার জন্য বসে যাওয়া উচিত। আর, বিষয়টিকে যেন হার-জিতের মানদণ্ডে বিবেচনা করা না হয়। তারাবির নামাজ একটি ইবাদত। আর ইবাদত রিলেটেড ইখতেলাফি মাসআলা সমাধানের জন্য বসাও একটি ইবাদত। সুতরাং, ইবাদতটি যেন একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে হয়। কাউকে ঘায়েল করা বা তোয়াজ করার জন্য নয়।

৬.
ইসলামী শরিয়তে এমন অনেক ব্যাপার আছে যার অনুমতি ছিল না। পরবর্তীকালে মুতাআখখিরিন মুফতিগণ সময়ের সামগ্রিকতা বিবেচনায় বৈধতার ফতওয়া দিয়েছেন, এবং তাঁরা সঠিক কাজটাই করেছেন। আর সময়ের সিদ্ধান্ত যথাসময়ে নিতে পেরেছিলেন বলেই আজও পৃথিবীর মসজিদ মাদরাসাগুলো সুন্দরভাবে টিকে আছে। হাফিজদের হাদিয়ার ব্যাপারে এই সময়ের মুফতিগণ বর্তমান সময় এবং আগামীর কথা বিবেচনায় মুতাআখখিরিনের নীতিই ফলো করবেন বলে আমরা আশা করতে চাই।

৭.
আমরা চাই বর্তমান বাস্তবতার বিবেচনায় কোরআন হাদিস ও ইসলামী ফিক্বহের আলোকে বিষয়টির সুরাহা হোক। প্রতি বছর রমজান এলে বিষয়টি নিয়ে পাল্টা পাল্টি ফতওয়া দেখতে আর ইচ্ছে করছে না।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ