ঈদের নামাজের বিস্তারিত মাসাইল

প্রকাশিত: ২:০৯ অপরাহ্ণ, মে ২৪, ২০২০

ঈদের নামাজের বিস্তারিত মাসাইল

মুফতি আমিনুর রশিদ গোয়াইনঘাটী (হাফিযাহুল্লাহ)

১.ঈদের নামাযের নিয়্যাত
(ক) মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যাত করা জরুরী নয়। নিয়্যাতের হাক্বীকত এবং প্রকৃত অর্থ হল, ইচ্ছে করা, সংকল্প করা। আহলুস্ সুন্নাত ওয়াল জামাতের উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে নামাজের নিয়্যাত অন্তর দিয়ে করলেই যথেষ্ট হয়ে যাবে। যদিও সালাফীরা এ ব্যাপারে হানাফী উলামায়ে কেরামের ওপর অহেতুক মিথ্যে অপবাদ দিয়ে থাকে যে, হানাফী উলামায়ে কেরাম না কি বলে থাকেন, মুখে উচ্চারণ করে নামাজের নিয়্যাত করতে হবে।( দেখুন, সালাফীদের রচিত -সালাত অব দ্যা প্রুফেট পৃ: ১০)।
সুতরাং তাদের এ অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। (দুররুল মুখতার -সালাত অধ্যায়)

(খ) যদি কেউ ঈদের নামাযের ( অথবা অন্য কোন নামায, রোযা ইত্যাদি) নিয়্যাত অন্তর দিয়ে (যেমন -আমি ঈদুল ফিতরের দু’ রাকাত ওয়াজিব নামায ৬ তাকবীরের সাথে ইমাম সাহেবের পিছনে পড়ছি) করার সাথে সাথে (একাগ্রতার কারণে) মুখেও উচ্চারণ করে, তাহলে বেশ ভাল ( মুস্তাহাব)। এটাই নির্ভরযোগ্য মত। (আদ -দুররুল মুখতার-১/৩৯৪, কাযী খাঁন, হেদায়া -১/৯৬, শামী-১/৩৮৬) ।

(খ) তবে মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যাত করতেই হবে, এমন বিশ্বাস রাখাটা বিদআত। সালাফীরা এখানে একটা বিভ্রান্তি ছড়ায়, তারা বলে বেড়ায়,’ নামাযে মুখে উচ্চারণ করে নামায পড়া বিদআত’ ( দেখুন, তাদের রচিত-সালাত অব দ্যা প্রুফেট-১০)। আসলে নামাযে মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যাত করলেই বিদআত হয়ে যায় না বরং মুখে উচ্চারণ করে নিয়্যাত করাটা জরুরী মনে করা বিদআত। (ফাতাওয়া দারুল উলুম-২/১৮৪, আহসানুল ফাতাওয়া -৩/১৩)।

২.ঈদের নামায
ক.ঈদের নামাযের জন্যে জামাত শর্ত । সুতরাং ঈদের নামায জামাত ছাড়া একাকী পড়লে দুরুস্ত হবে না। তবে যদি কোন কারণে জামাত ছুটে যায় অথবা অনেকের নামায ফাসেদ হয়ে যায়, তাহলে তারা ( পূর্ববর্তী ইমাম ও মুকতাদী ছাড়া) অন্য কাউকে ইমাম বানিয়ে জামাতে নামায পড়তে পারবে। তবে ঈদগায়( বা মাসজিদে) এক জামাত হয়ে গেলে দ্বিতীয় জামাত পড়া মাকরুহ। অন্য কোন জায়াগায় দ্বিতীয় জামাতের ব্যবস্হা করতে হবে।(ফাতাওয়া শামী, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/১৩৫, বেহেশতী যেওর-২/২০৭)।
উল্লেখ্য, জামাত পড়ার মত কাউকে না পেলে, শুধু আল্লাহর নিকট তাওবা -ইস্তেগফার করবে। ঈদের নামাযের কোন কাযা বা কাফ্ফারা নেই। (আপকে মাসায়েল -২/৪১৮)।

(খ) কোন ওযরবশত: ঈদুল ফিতরের দিনে ( ১ লা শাওয়াল দ্বিপ্রহরের পূর্বে) নামায পড়তে না পারলে পরের দিনেও পড়তে পারবে, তারপর আর পড়া যাবে না। তবে ঈদুল আযহার নামায ১০ যিলহাজ্জে না পড়তে পারলে ১১ অথবা ১২ তারিখ পর্যন্ত পড়া যাবে। কিন্তুু বিনা ওযরে ১লা শাওয়াল ঈদুল ফিতরের নামায না পড়ে থাকলে ২ রা শাওয়াল পড়া যাবে না।( কবীরী, বেহেশতী যেওর-২/২০৭)।

(গ) যদি কেউ ঈদের জামাতের প্রথম রাকাতে ইমামের অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলার পরে নামাযে এসে শরীক হয়, তাহলে ইমাম রুকুতে না গিয়ে থাকলে ‘মাসবুক’ (যে এসে পরে শরীক হল) নিয়ত বেঁধে একাই তিন তাকবীর বলে নিবে।(শামী,আপকে মাসায়েল -২/৪১৬)

(ঘ) আর যদি ইমাম সাহেব রুকুতে চলে যান,তাহলে – যদি অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলে ইমাম সাহেবকে রুকুতে পাওয়ার প্রবল ধারণা থাকে, তাহলে নিয়তের পরে দাঁড়ানো অবস্হায়ই তিন তাকবীর বলে রুকুতে চলে যাবে। আর যদি তাকবীর বলতে গেলে রুকু হারানোর প্রবল ধারণা হয়, তাহলে দাড়িয়ে নিয়ত বেঁধেই রুকুতে শরীক হয়ে যাবে এবং সাথে সাথে তিন তাকবীর বলে নিবে। এসময় তাকবীরের জন্যে কানে হাত ওঠানো লাগবে না। (তাকবীর পূর্ণ করার আগে ইমাম রুকু থেকে ওঠে গেলে বাকি তাকবীর তার যিম্মা থেকে রহিত হয়ে যাবে, আর তাকবীর বলা লাগবে না।) অত:পর সময় পেলে রুকুর তাসবীহ পড়বে। নতুবা পড়বে না। (ফাতাওয়া শামী-১/৭৮১, আহসানুল ফাতাওয়া -৪/১৫৩, আপকে মাসায়েল -২/৪১৬)।

(ঙ) যদি ইমাম সাহেব রুকু থেকে ওঠে যান, তবে ‘মাসবুক’ যথারীতি ইমামের সাথে শরীক হয়ে দ্বিতীয় রাকাত পড়বে এবং ইমাম সালাম ফিরালে ছুটে যাওয়া রাকাতের জন্যে দাঁড়াবে। প্রথমে সানা পড়ে (ছুটে যাওয়া অতিরিক্ত তিন তাকবীর এখানে না বলে ) আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়ে সুরা ফাতেহা ও অন্য সুরা মিলিয়ে নিবে। অত:পর (রুকুতে যাবার আগে) অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলবে। তারপর রুকু করে যথারীতি নামায শেষ করবে।( ফাতাওয়া শামী -১/৭৮১, আহসানুল ফাতাওয়া -৪/১৫৩,আপকে মাসায়েল -২/৪১৬)।

ঈদের নামাযের জরুরি মাসাঈল
(ক) যদি কেউ ইমাম সাহেবকে ঈদের জামাতের দ্বিতীয় রাকাতের রুকুতে পায়,তাহলে দ্বিতীয় রাকাতের অতিরিক্ত তিন তাকবীর বলেও যদি ইমামকে রুকুতে পাওয়ার প্রবল ধারণা থাকে, তাহলে দাঁড়ানো অবস্হায় তিন তাকবীর বলে রুকুতে চলে যাবে।
আর যদি তাকবীর বলতে গেলে রুকু হারানোর প্রবল ধারণা হয়, তাহলে নিয়্যাত বেঁধেই রুকুতে শরীক হয়ে যাবে এবং সাথে সাথে তিন তাকবীর ( রুকুতে হাত না ওঠিয়ে) বলে নিবে। অত:পর সময় পেলে রুকুর তাসবীহ পড়বে। নতুবা পড়বে না। ( রুকুতে তিন তাকবীর পূর্ণ করার আগে ইমাম সাহেব রুকু থেকে ওঠে গেলে বাকি তাকবীর মাফ হয়ে যাবে।)। ( ফাতাওয়া শামী-১/৭৮১,ফাতাওয়া হিন্দিয়া- ১/১৫১)।

(খ) যদি কেউ দ্বিতীয় রাকাতের রুকু থেকে ওঠার পর ইমামের সাথে শরীক হয়, তাহলে ইমাম সালাম ফিরানোর পর মাসবুক দাঁড়িয়ে সানা, অতিরিক্ত তিন তাকবীর, অাউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ সুরা, ক্বিরাত ইত্যাদি পড়ে যথারীতি ( অর্থাৎ -ঈদের নামাযের সাধারণ নিয়মেই) উভয় রাকাত শেষ করবে।(ফাতাওয়া হিন্দিয়্যা -১/১৫১)।

(গ) যদি ইমাম সাহেব দাঁড়ানো অবস্হায় তাকবীর বলতে ভুলে যান এবং রুকুতে যাওয়ার পরে মনে হয়, তাহলে ইমাম রুকু অবস্হায় (হাত না ওঠিয়ে) তাকবীর বলে নিবেন। রুকু ছেড়ে তাকবীরের জন্যে দাঁড়বেন না। যদি দাঁড়িয়ে যান,তাহলে এক বর্ণনা মতে নামায ফাসেদ হয়ে যাবে, তবে নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী নামায ফাসেদ হবে না। কিন্তু এ অবস্হায় দ্বিতীয় বার রুকু করা যাবে না। রুকু করলে নামায পুনরায় পড়তে হবে। ( আহসানুল ফাতাওয়া -৪/১২৬)।
কিন্তু অাবার রুকু দিলেও নামায সহীহ হয়ে যাবে বলে এক জামাত ফুক্বাহায়ে কেরাম মতামত পেশ করেছেন। (বেহেশতী যেওর-২/২০৮)।
এ ব্যাপারে যেহেতু ফুক্বাহায়ে কেরামের মাঝে মতভেদ রয়েছে, তাই এ অবস্হা পরিহার করে চলাই ভাল। ( অর্থাৎ রুকু থেকে না দাঁড়িয়ে রুকু অবস্হায় তাকবীর আদায় করে নিবে)

ঈদের নামাযের বিবিধ মাসাঈল
(ক) ঈদের নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্যে জুমুআর নামাযের মত জামাত শর্ত। এটা হানাফী উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। ইমামের পিছনে জামাতে নামায পড়তে না পারলে একা একা পড়া যাবে না। ঈদের নামাযের কোন কাযা নেই, কাফ্ফারাও নেই। ঈদের নামায ছুটে যাওয়ার কারণে আল্লাহর কাছে শুধু তাওবা ইস্তেগফার করতে হবে। তবে কেউ ইচ্ছে করলে চাশতের নিয়তে একা একা চার রাকাত নামায পড়তে পারবে- এটা ভিন্ন কথা। ( মারাকিউল ফালাহ,আপকে মাসায়েল -২/৪১৮, বেহেশতী যেওর-২/২০৭)।

(খ) যেখানে ঈদগাহের ব্যবস্হা নেই কিংবা মাসজিদে জায়গার সংকুলান হয় না-এরূপ ক্ষেত্রে কোন প্রশস্ত ময়দানে ঈদের জামাত পড়া যেতে পারে। যদি কোন ময়দানেও ব্যবস্হা করা না যায়, তাহলে কোন প্রশস্ত হলঘরে ঈদের জামাতের ব্যবস্হা করবে। একটা হলঘরে যদি সমস্ত লোকের সংকুলান না হয়, তাহলে অবশিষ্ট লোকজন আরেকটা প্রশস্ত ঘরে জামাত পড়বে। শরীয়তসম্মত ওযর-অপারগতা ব্যতীত একই স্হানে দ্বিতীয়বার -তৃতীয়বার জামাত করা না চাই। এমনটা করা মাকরুহ। যথেষ্ট চেষ্টা – তাদবীর করা সত্ত্বেও অন্যত্র কোন ব্যবস্হা করতে না পারলে এবং এ পরিস্হিতিতে ঈদের নামাযই ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে একই স্হানে পুনরায় জামাত করা যেতে পারে। ( ফাতাওয়া রহীমিয়া-৫/৩৬)।

(গ) ঈদের নামাযের পূর্বে ঘরে, মাসজিদে বা ঈদগাহে এবং ঈদের নামাযের পরে ঈদগাহে যে কোন নফল নামায পড়া মাকরুহ। অবশ্য ঈদের নামাযের পরে বাড়িতে বা মাসজিদে নফল পড়া মাকরুহ নয়। এমনিভাবে মহিলাগণ নিজ নিজ এলাকায় ঈদের নামায হওয়ার পূর্বে ইশরাক বা অন্য কোন নফল নামায পড়তে পারবে না। পড়লে মাকরুহ হবে। (বাহরুর রায়েক -২/২৮০, খুলাসাতুল ফাতাওয়া -১/২৪১, তাবয়ীনুল হাক্বাইক-১/২২৪, বেহেশতী যেওর -২/২০৬)।

(ঘ) ঈদের নামাযে খুতবা দেয়া সুন্নাত। কিন্তু নীরবে শোনা ওয়াজিব। সুতরাং খুতবা ছাড়া ঈদের নামায পড়লে নামায হয়ে যাবে। কিন্তু এভাবে পড়া সুন্নাতের পরিপন্হী। খুতবায় নবীজির নাম শোনে দুরুদ শরীফ বা খুতবায় ইমাম সাহেব তাকবীর বললে সাথে সাথে মুখে উচ্চারণ করে তাকবীর বলা যাবে না। তবে মনে মনে বলা যেতে পারে। আমরা অনেকে এ ব্যাপারে গাফেল থাকি। ( ফাতাওয়া শামী-৩/৩৫, মাজমাউল আনহার-১/১৭১, তাতারখানিয়া-১/৬৭, আপকে মাসায়েল -২/৪১৭,বেহেশতী যেওর -২/২০৫, জাওয়াহেরুল ফেক্বাহ -২/৫২২, আহসানুল ফাতাওয়া -৪/১২৩)।

(ঙ) ঈদের প্রথম খুতবার শুরুতে ৯ বার, দ্বিতীয় খুতবার শুরুতে ৭ বার এবং খুতবার একেবারে শেষে ১৪ বার লাগাতার ‘আল্লাহু আকবার ‘বলা মুস্তাহাব। অনেক খতীব এ ব্যাপারে গাফেল থাকেন। বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। ( বেহেশতী যেওর -২/২০৬, আহসানুল ফাতাওয়া -৪/১৩৭)।

(চ) ঈদের নামাযের ৬ তাকবীরের মধ্যে প্রত্যেকটা তাকবীর বলা ওয়াজিব। সুতরাং একটা তাকবীর ছুটে গেলেও সেজদায়ে সাহু ওয়াজিব হবে। কিন্তু যদি ঈদের নামাযে এত বেশি মুসাল্লীর সমাবেশ ঘটে যে,সেজদায়ে সাহু আদায় করলে নামাযে বিভ্রান্তির আশঙ্কা হয়, তাহলে সেজদায়ে সাহু দেয়া লাগবে না, মাফ হয়ে যাবে। তবে মুসাল্লী একেবারে কম হলে দিতে হবে। অনুরূপ জুমুআর নামাজ বা সম্মেলন, মহাসম্মেলনে মুসাল্লী বেশি হওয়ার দরুন সেজদায়ের সাহু দেয়া লাগবে না; মাফ হয়ে যাবে। (ফাতাওয়া শামী-১/৭০৫, আহসানুল ফাতাওয়া -৪/৩৯)।
আল্লাহ তা’লা আমাদেরকে সঠিকভাবে মাসআলা বোঝে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।।

সংগ্রহ করেছেন: মুফতি নূরুযযামান সাঈদ হাফিযাহুল্লাহ

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ